ব্রেকিং নিউজ >>>
ঢাকা, নভেম্বর ২০, ২০১৮, ৬ অগ্রহায়ন ১৪২৫
ICT News | Online Newspaper of Bangladesh |
প্রথম পাতা » আইসিটি শিল্প ও বানিজ্য » বাংলাদেশের বিপিও শিল্পখাত: আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি
বুধবার ● ৯ ডিসেম্বর ২০১৫
Decrease Font Size Increase Font Size Email this News Print Friendly Version

বাংলাদেশের বিপিও শিল্পখাত: আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি

---তানভীর ইব্রাহীম

 

মার্চ, ২০০৮ থেকে ডিসেম্বর, ২০১৫। ৭ বছর ৯ মাস। সময়টা বেশি নয়। তবে পরিবর্তনটা ব্যাপক। বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে এরই মধ্যে বিপ্লব ঘটে গেছে। ডিজিটাল টেকনোলজির অগ্রগতি দ্রুত এবং বিস্ময়কর। পেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক উদ্ভাবন প্রজন্ম। উল্লেখিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং ইন্ডাস্ট্রিও এগিয়েছে। অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছানোর প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে।

মাত্র ৭০০ কর্মচারী নিয়ে শুরু করে বর্তমানে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মীসংখ্যা অন্তত ২৫ হাজার। শুরু হয়েছিল কল সেন্টার দিয়ে। আজ এই ইন্ডাস্ট্রি আর সেখানে দাঁড়িয়ে নেই। বরং সেবায় বৈচিত্র এসেছে। প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নানা ধরনের আউটসোর্সিংয়ের কাজ। দেশে যেমন বাজার বিস্তার ঘটছে তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারও বাড়ছে। বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় বিপিও গন্তব্য হিসাবে স্বীকৃত হতে শুরু করেছে। এই ইন্ডাস্ট্রির আর্ন্তজাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে ক্রমেই উপরের দিকে উঠে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন জরিপ প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে চলেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশেষ ইতিবাচক দিকগুলো হলো: এক. বর্তমানে বিশ্বের উদীয়মান বিপিও দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে ব্যয় সাশ্রয়ী। দুই. এই ইন্ডাস্ট্রির চালিকাশক্তি যে জনগোষ্ঠী অথ্যাৎ তরুণ প্রজন্ম; বাংলাদেশে এই মুহুর্তে তাদের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ কোটি। তিন. সরকার এই শিল্পখাতকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। চার. টাইম জোনের দিক থেকে বাংলাদেশ ভৌগলিক অবস্থানভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাবনা এবং সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দেশি এবং বিদেশী ভোক্তাদের সেবা দেয়ার মতো অবকাঠামোগতভাবে (নেটওয়ার্ক, কানেকটিভিটি, লজিস্টিকস আর স্পেস) শক্তিশালী অবস্থানে আমরা আছি কিনা। কিংবা এই শিল্পখাত পরিচালনায় আমরা কতটা পারঙ্গম। এখন এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যৌক্তিক এবং বাস্তবিকভাবে পর্যালোচনার এখনই সঠিক সময়।

আগামী দশককে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এগোতে পারলে আন্তর্জতিক বিপিও বাজারে বাংলাদেশ একটা অবস্থান করে নিতে পারবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের আমাদের উপস্থিতি উল্লেখ করার মতো নয়। বিশ্বজুড়ে এখন ৫০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি এই বাজারে আমাদের অংশীদারিত্ব মাত্র ০.০৪ শতাংশ। যেখানে ভারত আমাদের চেয়ে ১৮৫ আর ফিলিপাইন আমাদের চেয়ে ১৬৫ গুণ এগিয়ে। শ্রীলঙ্কাও বেশ এগিয়ে আছে আমাদের থেকে। তাদের বার্ষিক টার্নওভার ২০০ কোটি ডলার। আমাদের আপাতত লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে ১০০ কোটির শিল্পখাত হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা।

আপাতত আমাদের করণীয় হবেÑ ১. নতুন নতুন উদ্ভাবন আর বেস্ট প্র্যাকটিসগুলোকে গ্রহণ করা, সঠিক মূল্যমান প্রস্তাবনা আর পরিবেশের নিশ্চয়তায় দেশি ও বিদেশী বিনিয়োগকারী এবং ভোক্তাদের আকৃষ্ট করা। ২. মধ্যম আয়ের ক্যারিয়ার হিসাবে এই খাতটি কতখানি উপযুক্ত সেটা স্পষ্ট করে তরুণদের বোঝানো এবং গণমাধ্যমের সহায়তায় এই খাত সম্পর্কে প্রচারণা চালানো। ৩. ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে বিপিও কতটা কার্যকর আর উপযোগী হতে পারে সে বিষয়ে দেশজুড়ে সচেতনতা সৃষ্টি। এবং ৪. নানা উপলক্ষ্য আর উদযাপনের মধ্যে দিয়ে নিয়মিতভাবেই আমাদের বিপিও ইন্ডাস্ট্রির সাফল্যকে দেশে এবং বিদেশে তুলে ধরা। বিপিও মহাসম্মেলন এক্ষেত্রে একটা বড় প্ল্যাটফর্ম, সন্দেহ নেই।

তাহলে আমরা একটা গ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই দৃঢ়তর অবস্থানে উন্নীত হতে পারব। কারণ বিপিও ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ উদ্যোক্তারা এর ভবিষ্যত বাজার বৃদ্ধির ব্যাপারে স্থির নিশ্চিত। তবে ভবিষ্যতের ব্যবসা পরিচালনা এবং তা থেকে সুফল তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি বিষয়কে নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। এখানে ঘুরে ফিরে আবারও অবকাঠামোর কথা আসে। এটা গুছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। বিশ্বায়নের চলমান প্রক্রিয়ায় সরকারকে আরো সক্রিয় হয়ে আধুনিক মনোভাব নিয়ে দ্রুত এগোতে হবে। বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালাকে ভালো বলার আগেই তা নিশ্চিত করে রাখতে পারলে অর্ধেক কাজ হাসিল হয়ে যাবে বলেই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। ঠিক এই কাজটা অন্যান্য দেশ করছে। ভারত আর ফিলিপাইনের কথা না হয় বাদই দেয়া গেল; এক্ষেত্রে বরং শ্রীলঙ্কা হতে পারে আমাদের জন্য যুতসই উদাহরণ।

তবে আশার কথা সরকার অবশ্য বাংলাদেশের বিপিও ইন্ডাস্ট্রির অগ্রযাত্রাকে নির্বিঘœ করার ব্যাপারে যথেষ্ট তৎপর। ইতোমধ্যে প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট প্রজেক্ট (পিএসডিএসপি)-এর আওতায় ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে স্পেসিফিক ইনভেস্টমেন্ট লোন (এসআইএল) নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের কাজ সরকার বেশ আগেই শুরু করে দিয়েছে। অত্যাধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবা ও হাইটেক ম্যানুফ্যাচারিংয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে গৃহীত ঋণের অর্থে। অন্যদিকে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি (বিএইচটিপিএ) হাই-টেক পার্ক ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আইটি পার্ক গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছে। কালিয়াকৈরে ২৩২ একর জমির উপর প্রথম হাই-টেক পার্ক নির্মাণের কাজ চলছে। সেখানে যাতায়াতের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে কালিয়াকৈর ট্রেনলাইন হচ্ছে। পাশাপাশি কাওরান বাজারের জনতা টওয়ার, যশোর, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইটি পার্ক গড়ে তুলবে সরকার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসব পদক্ষেপ নেয়ার পর তা দ্রুত বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বাজার উপযোগী এবং প্রস্তুত জনবল তৈরিও সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। এজন্য বিভিন্ন ধরণের ট্রেনিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সরকারের আরো দায়িত্ব রয়েছে। অবকাঠামো তৈরি করে দিয়ে যেমন এই খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ তৃতীয়পক্ষ দিয়ে করিয়ে এই আউটসোর্সিং শিল্পখাতে অগ্রযাত্রায় সক্রিয় শরিক সরকার হতে পারে।  জনগণকে উন্নত সেবা দেয়ার জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণাকে বাস্তবসম্মত উপায়ে কাজে লাগাতে হলে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজকে তৃতীয়পক্ষকে দিয়ে করানো ছাড়া সত্যিই বিকল্প নেই। তাতে করে সময়, অর্থ দুটোই, বাঁচবে, সিস্টেম লস হ্রাস পাবে; সরকারের ভোক্তাসেবা আরো সহজ এবং অবাধ হওয়ার মধ্যে দিয়ে জনগণের হয়রানি কমবে। সাধারণ মানুষ খুশি থাকবে।

বাস্তবতা বলছে সরকারের কোন একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ দিয়েই অসংখ্য বিপিও প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে যেতে পারে। বাস্তবতা হলো, এই মুহুর্তে সরকারের প্রচুর কাজও রয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আগামী দশ বছরে অভ্যন্তরীন বিপিও বাজারে অন্তত ৬০ শতাংশ কাজ আসা উচিত সরকারের কাছ থেকে। সরকার ছাড়াও তো রয়েছে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্যরা। তারপরও থেকে যায় বিদেশী বাজার। সেটা ধরার জন্য সরকারকে দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপনের ব্যাপারে আরও সক্রিয় হতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকেই যে এ কাজে হাত লাগাতে হবে তেমনটা মনে করেন না বিশেজ্ঞরা। বরং তারা মনে করছেন সরকারের উদ্যোগটাই মূল। যে কোন আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা তাদের লাভ বুঝে নিলেও অবকঠামোটা আমাদেরই থেকে যাবে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের উত্তরোত্তর সুবিধা আউটসোর্সিং খাতের উন্নয়ন এবং বৃদ্ধি ত্বরাণি¦ত করবে।

এদিকে বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ব ও বেসরকারী ব্যাঙ্ক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কোর ব্যাঙ্কিংটা নিজেদের কাছে রেখে বেশিরভাগ কাজ তৃতীয়পক্ষকে দিয়ে করিয়ে নিতে। বাইরের দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবেই তাদের অপারেশনস চালাচ্ছে। প্রভূত কার্যকর এই পদ্ধতি সেবার মান বাড়ায়। সেবা দ্রুততর হয়। ভোক্তা খুশি থাকে। পরিচালনা ব্যয় কমার ফলে মুনাফা বাড়ে। ফলে কম সুদে ঋণ সম্ভবপর হয়। অন্যদিকে ভোক্তাকে অধিক সুদ দিয়ে আরেকভাবে সন্তুষ্টও রাখা যায়।

এখনও পর্যন্ত যে সব খাত বিপিও সেবা গ্রহণ করেছে তার মধ্যে সর্বাগ্রে আছে টেলিকমিউনিকেশন। এছাড়া ট্র্যাভেল অ্যান্ড টুরিজম, মিডিয়া অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট, হেলথকেয়ার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এনার্জি অ্যান্ড ইউলিটি, ইন্টারনেট সার্ভিব প্রভাইডার, ওয়েবপোর্টাল, সরকার, পরিবহন ইত্যাদি।

এসব খাতের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম করা যেতেইপারে। যাদেরকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টারস অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য)-এর সদস্যরা সফলভাবে সেবা দিয়েছে। এই তালিকায় আছে সবকটি মোবাইল ফোন অপারেটর- এয়ারটেল, বাংলালিংক, গ্রামীণফোন, রবি, সিটিসেল, টেলিটক, ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোবাকো, ইউনিলিভার, নেসলে, কিউবি, বিক্যাশ, বিক্রয়ডটকম, স্যামসাং, ইউএনডিপি, আইএফসি, প্রাণ, বিমান বাংলাদেশ, ট্রান্সকম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আকিজ গ্রুপ, ইত্যাদি।

পরিশেষে উল্লেখ আবশ্যক, দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষা প্রদানকে নিশ্চিত করা এবং ডিগ্রি অর্জনে বর্তমানের কঠিন নিয়মকানুনকে শিথিল ও নমনীয় করার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও রয়েছে বিপিও খাতের উন্নয়ন ও বিস্তার এবং বিদেশীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে নীতিমালা সহজ, সময় উপযোগী এবং বৈশ্বিক গতিপ্রকৃতির উপর নির্ভর করে পরিবর্তনশীল করার দাবী। বিপিও মহাসম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা এসব বিষয়ে আলো ফেললে সবকিছু স্পষ্ট হবে। সবাই বিশদের অবগত হবে। এই শিল্পের প্রত্যাশিত অগ্রগতির জন্য আপাতত এর বিকল্প নেই।

 

লেখক॥ ফাইন্যান্স সেক্রেটারি, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ কলসেন্টার এন্ড আউটসোর্সিং।


আমরা করব জয় নিশ্চয়

সাফল্যের নবজাগরণের আলোন্দিত হবে বাংলাদেশ


পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)
কার্ডে ঈদের কেনাকাটায় ব্যাংকের ছাড়
এসপি বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে নিয়ে গেছে পুলিশ
পৌর নির্বাচন নিয়ে মোবাইল অ্যাপ
নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানির উদ্যোগে সাড়া মেলেনি